উলফা ও আরেকটি গোষ্ঠী অংশ নিয়েছিল ওই আক্রমণে?


গ্রেনেড হামলা চলাকালে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ। ছবি: জিয়া ইসলাম
(২১ আগস্ট, ২০০৭ সালে প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন। বানানরীতি ও অন্যান্য বিষয় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।)

তিন বছর আগে ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিল হরকাতুল জিহাদের (হুজি) জঙ্গিরা। মুফতি হান্নানের নির্দেশে ওই হামলায় অংশ নেয় প্রশিক্ষিত ১২ জঙ্গি। ওই হামলায় আইভি রহমানসহ ২২ জন নিহত হন। আহত হন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাসহ অনেকে। 

হরকাতুল জিহাদের একাংশের শীর্ষস্থানীয় নেতা মুফতি আবদুল হান্নানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এ তথ্য পাওয়া গেছে বলে গোয়েন্দা সূত্রগুলো দাবি করেছে। ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর মুফতি হান্নানকে ঢাকার বাড্ডা থেকে গ্রেপ্তার করে যৌথ জিজ্ঞাসাবাদ সেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার বিবরণ দিয়েছেন। এ পরিকল্পনার পেছনে কোনো দেশি-বিদেশি দল, গোষ্ঠী বা সংস্থার ইন্ধন কিংবা সহযোগিতা ছিল কি না, এ সম্পর্কে তিনি কোনো তথ্য দিয়েছেন কি না, তা জানা যায়নি। তবে হামলার আগে মুফতি শহীদুল ইসলামসহ কয়েকজনের সঙ্গে পরামর্শ করার কথা বলেছেন তিনি।
এদিকে ভারতের আসাম রাজ্যের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী উলফার (ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম) এক নেতা গ্রেপ্তারের পর সে দেশের পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, ২১ আগস্ট হামলায় উলফা ও হুজি জঙ্গিরা আলাদাভাবে অংশ নিয়েছিল। তবে ঘটনার আগে পর্যন্ত দুই পক্ষ পরস্পরের সম্পর্কে জানত না। গত জানুয়ারি মাসে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ তথ্য প্রকাশিত হয়।
এ ছাড়া ২১ আগস্ট হামলার পরপর বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে এ হামলার সঙ্গে প্রতিবেশী একটি দেশের গোয়েন্দা সংস্থা জড়িত বলে উল্লেখ করা হয়। আর মামলার তদন্তে নিয়োজিত পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জজ মিয়া, আবুল হাসেম রানা ও শফিক নামে তিন যুবককে গ্রেপ্তার করে এবং গ্রেনেড হামলায় জড়িত ছিলেন বলে তাদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করে। এমনকি এ নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টিরও নানা চেষ্টা হয়েছে। গত তিন বছর এ মামলার তদন্ত এগিয়েছে খাপছাড়াভাবে নানা সূত্র ধরে। ফলে শুরু থেকেই তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
এতদিন জজ মিয়ার স্বীকারোক্তিকেই প্রামাণ্য হিসেবে ধরে নিয়ে তদন্ত এগোলেও এখন তদন্তে মুফতি হান্নানের বক্তব্যকে গুরুত্ব দিচ্ছে বলে সিআইডির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান। অবশ্য এর আগে গত ৫ মে স্বরাষ্ট্রসচিব আবদুল করিম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ২১ আগস্ট মামলাটির তদন্ত অনেক এগিয়েছে। মামলার তদন্ত সঠিক পথে এগোচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
পরিকল্পনা ও হামলা হয় যেভাবে: গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে মুফতি হান্নান জানান, ২০০৪ সালের ১৯ আগস্ট সন্ধ্যার দিকে রাজধানীর পশ্চিম বাড্ডায় একটি বাসায় সংগঠনের সদস্য আহসান উল্লাহ কাজল (যশোর), আবু জান্দাল, ফরিদপুরের মুরসালিন ও মুত্তাকিন, খুলনার মাহমুদ ও লিটন বৈঠক করেন। বৈঠকে কাজল একটি পত্রিকার খবর দেখিয়ে বলেন, ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশ হবে। সেখানে একটি প্রোগ্রাম (হামলা করা) নেওয়া যায়। কাজলের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে মুফতি হান্নান তখনই টেলিফোনে এ বিষয়ে ফরিদপুরের কামাল উদ্দিন শাকের, আবদুর রহমান, যশোরের মাওলানা মনিরুল ইসলাম মদিনা, মাওলানা রুস্তম আহমেদ ও মুফতি আরিফ বিল্লাহকে (ঝিনাইদহ) জানান এবং তাঁদের ঢাকায় আসতে বলেন। অবশ্য তাঁরা ঢাকায় আসেননি। খবর পেয়ে মাওলানা আবু সাইদ (ডাক্তার) সন্ধ্যার পরে এসে ওই বৈঠকে যোগ দেন। পরিকল্পনার কথা শুনে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের হামলার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোক দরকার, কিন্তু এ মুহূর্তে আমার কাছে লোক নেই।’ তখন কাজল জানান, ‘লোক পাওয়া যাবে। এ জন্য ইসলামী ফাউন্ডেশনের আনস সাহেব ও খেলাফত মজলিসের সাংসদ মুফতি শহীদুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলব।’ পরে কাজল টেলিফোনে আনসের সঙ্গে কথা বলেন এবং এ কাজে (হামলায়) তাঁর সহযোগিতা চান। আনস সাহেব তাঁকে তাঁর মোহাম্মদপুরের বাসায় যেতে বলেন। পরদিন কাজল ওই বাসায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন এবং একই দিন মুফতি শহীদুলের সঙ্গেও দেখা করেন।
জিজ্ঞাসাবাদে মুফতি হান্নান জানান, হামলা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতে পরদিন ২০ আগস্ট সকালে একই বাসায় আবু সাইদ, লিটন, কাজল, আবু বকর (যশোর) ও তিনি নিজে আবার বৈঠকে বসেন। কারা কারা হামলায় অংশ নেবে, কাজল তাঁদের তালিকা তৈরি করে বৈঠকে দেখান। বৈঠকে হামলার জন্য অস্ত্র ও টাকা-পয়সার ব্যবস্থা আছে কি না জানতে চাইলে কাজল জানান, গ্রেনেড আছে। টাকার ব্যবস্থাও হবে। ওই দিনই (২০ আগস্ট) কাজল ও আবু জান্দাল বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে গিয়ে এলাকা পর্যবেক্ষণ (রেকি) করে আসেন। ২১ আগস্ট সকালে একই বাসায় উল্লিখিত সবাই এবং হামলায় অংশ নেওয়ার জন্য নির্বাচিতরা একত্র হন। সিদ্ধান্ত হয়, মোট ১২ জন হামলায় অংশ নেবে। এতে কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন কাজল ও আবু জান্দাল। এরপর বাড্ডার ওই বাসায় তাঁরা সবাই একসঙ্গে জোহরের নামাজ পড়ে দুপুরের খাবার খান। তারপর ঘরের ভেতর সবাই বসেন। সেখানে মাওলানা সাইদ জিহাদবিষয়ক বয়ান করেন। তারপর মুফতি হান্নান হামলার জন্য নির্বাচিত ১২ জনের হাতে ১৫টি গ্রেনেড দেন। এরপর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আসরের নামাজের সময়ে সবাই যাঁর যাঁর মতো গিয়ে গোলাপ শাহ মাজারের কাছে মসজিদে মিলিত হন। সেখান থেকে তাঁরা সমাবেশে মঞ্চ হিসেবে ব্যবহূত ট্রাকটির চারপাশে অবস্থান নেন। শেখ হাসিনার বক্তব্য শেষ হওয়ার পরপরই আবু জান্দাল প্রথম গ্রেনেড ছোড়েন, তারপর অন্যরা একে একে গ্রেনেড ছুড়ে যাঁর যাঁর মতো চলে যান বলে মুফতি হান্নান বলেছেন।
তবে মাত্র দুই দিন আগে সিদ্ধান্ত নিয়ে এত বড় আক্রমণ করা সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ ছাড়া সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর গ্রেনেড হামলা মামলার অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি শরিফ শাহেদুল আলম ওরফে বিপুলও গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলাসংক্রান্ত কিছু তথ্য দেন। বিপুলের ভাষ্যমতে, তিনি ২০০৪ সালের ১৯ আগস্ট ঢাকায় মুফতি হান্নানের বাড্ডার বাসায় গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। সেখানে তখন হান্নানের ভাই মফিজুর রহমান ওরফে অভি এবং রফিক নামে একজন ছিলেন। তাঁরা ২১ আগস্টের হামলার বিষয়ে পরিকল্পনা করেন। মাগরিবের নামাজের পর ঘণ্টা দেড়েক আলোচনা হয়। এরপর রাতের ট্রেনেই বিপুল সিলেট চলে আসেন। পরদিন ২০ আগস্ট সকালে অভি ফোনে বিপুলকে বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে হালকা নাশতা করাতে হবে।’ হামলার ঘটনার কয়েক দিন পর বিপুল ঢাকায় এলে অভি তাঁর কাছে হামলার কথা স্বীকার করেন।
কে এই আনস: প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা যায়, হামলার আগে মুফতি হান্নান যে আনসের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন, তাঁর পুরো নাম আনিসুজ্জামান শিকদার। তিনি বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গোপালগঞ্জ কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সময় তিনি ঢাকায় ইমাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের দায়িত্বে ছিলেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রধান কার্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, আনিসুজ্জামানের কাছে প্রায়ই জঙ্গিগোষ্ঠী সংশ্লিষ্ট লোকজন আসত। যে কারণে অন্যদের কাজেও ব্যাঘাত হতে থাকে। ফলে কর্তৃপক্ষ তাঁকে ঢাকার বাইরে বদলি করে দেয়। প্রথম আলোর গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, আনিসুজ্জামানের আদি বাড়ি নড়াইলের নড়াগাথির বাকুরভাঙ্গার মুলশ্রী গ্রামে। এখন থাকেন গোপালগঞ্জে। বাবা আবুল বাশার শিকদার। তিনি প্রয়াত বিএনপির নেতা কে এম ওবায়দুর রহমানের আপন ভাগিনা। আনিসুজ্জামান জঙ্গি তত্পরতায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে প্রথম আলোকে বলেন, ২০০১ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে (ইফা) গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন। ছয় বছর ঢাকায় চাকরি করেন। ২০০৪ সালে তিনি ইফার ঢাকার ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমিতে দায়িত্বে ছিলেন। এরপর গণশিক্ষা কার্যক্রম (আগারগাঁও) ছিলেন সহকারী পরিচালক হিসেবে। ঢাকায় থাকাকালে মোহাম্মদপুরে ভাড়া বাসায় থাকতেন। এখনো তাঁর পরিবার মোহাম্মদপুরেই থাকে।
ভারতে গ্রেপ্তার দুই সহোদর: মুফতি হান্নানের জবানবন্দি অনুযায়ী ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় অংশ নেওয়া যমজ ভাই মুরসালিন ও মুত্তাকিনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তাঁদের বাড়ি ফরিদপুরে। গত বছর ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের নয়াদিল্লি রেলস্টেশনে ওই দেশের পুলিশের বিশেষ সেল তাঁদের গ্রেপ্তার করে। তাঁদের কাছ থেকে পুলিশ তিন কেজি বিস্ফোরক (আরডিএক্স), দুটি বৈদ্যুতিক ডেটোনেটর, দুটি পিস্তল, বাংলাদেশি পাসপোর্ট এবং ৪০ হাজার ভারতীয় রুপি উদ্ধার করে বলে ২৮ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিভিন্ন সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা ঢাকার পল্টনে সিপিবির সমাবেশে, রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে ও নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে বোমা হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন বলে ভারতীয় পুলিশ দাবি করে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে মুরসালিন ও মুত্তাকিনের বাবা বারি জামাল ফরিদপুরে প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদককে বলেন, তাঁর দুই ছেলে ঢাকার লালবাগ মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছে। তারা দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ার জন্য ভিসা নিতে ভারতে যায়। সেখানে দিল্লি পুলিশ তাদের সন্দেহমূলকভাবে আটক করে। তিনি দাবি করেন, তাঁর ছেলেরা কোনো জঙ্গিগোষ্ঠী বা সন্ত্রাসের সঙ্গে জড়িত নয়। ভারতীয় পুলিশ সাজানো মামলায় তাদের আটক করেছে।
আরেকজন সৌদি আরবে: ২১ আগস্ট আক্রমণকারী আরেকজন কামাল উদ্দিন শাকের ২০০০ সালে কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার সমাবেশস্থলে বোমা পুঁতে রাখা মামলারও আসামি। ১৯৯০ সালে তিনি পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে যান এবং সেখানে প্রশিক্ষণ নেন বলেও অভিযোগ আছে। শাকেরের ভাই ফরিদপুর পৌরসভার সাবেক কমিশনার খন্দকার মঞ্জুর কায়সার ফরিদপুরে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদককে বলেন, শাকের গোপালগঞ্জের গওহরডাঙ্গা মাদ্রাসা ও পাকিস্তানের একটি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছেন। এখন তিনি সৌদি আরবে। তিনি দাবি করেন, শাকের কোনো জঙ্গি তত্পরতায় জড়িত ছিল না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার শাকেরকে কোটালীপাড়ার বোমা মামলার আসামি করে এবং ২০০০ সালের ২৬ জুন গ্রেপ্তার করে। ২০০৩ সালের ২০ এপ্রিল তিনি জামিনে মুক্তি পান।
স্থানীয় পুলিশ সূত্র জানায়, ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী বোমা হামলার পর শাকের পুলিশের নজরদারিতে ছিল। তাঁকে প্রতিদিন থানায় গিয়ে হাজিরা দিতে হতো। ২০০৫ সালের ডিসেম্বরের পর শাকেরকে আর এলাকায় দেখা যায়নি।
উলফা নেতার বক্তব্য: গত ২০ জানুয়ারি বার্তা সংস্থা বিডি নিউজ ২৪ ডটকম-এর ভারতের গুয়াহাটি প্রতিনিধির একটি প্রতিবেদন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা বিষয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়। আসাম পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধান খগেন শর্মাকে উদ্ধৃত করে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, পল্লব সইকিয়া নামে এক উলফা জঙ্গি আসাম পুলিশ ও ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা আইবির জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, উলফার সামরিক শাখার প্রধান পরেশ বড়ুয়ার নির্দেশে তারা আওয়ামী লীগের সমাবেশে হামলা করে।
বিডি নিউজের খবরে বলা হয়, পল্লব সইকিয়া জানান, ‘ঢাকার গুলশানের একটি বাড়িতে বসে পরেশ বড়ুয়া ওই বছরের ২৬ জুলাই হামলার পরিকল্পনার কথা বলার পর আমি গোয়েন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করি।’ পল্লব সইকিয়া জানান, তিনি নিজে ২১ আগস্টের হামলার নেতৃত্বে ছিলেন। হামলায় তাঁর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ছিলেন রুবুল আলী। তবে রুবুল গত বছরের মে মাসে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে এক সংঘর্ষে মারা যান বলে পল্লব জানান। ২১ আগস্টে হামলাকারী উলফার ১১ জনের মধ্যে ছয়জন এখনো জীবিত আছেন বলে দাবি করেছেন পল্লব।
ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বিডি নিউজ ২৪ ডটকমকে বলেন, ‘বাংলাদেশের যেকোনো বাহিনী চাইলে পল্লবকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। তবে যাতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি না হয়, সে জন্য তাঁরাও ওই সময় থাকতে চান। চাইলে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলও তাঁকে জেরা করতে পারে।’
গত ২০ জানুয়ারি এ খবর প্রচার হওয়ার পর প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি গুয়াহাটি, কলকাতা ও নয়াদিল্লিতে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র ও সে দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এ ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে জানান, গ্রেপ্তার হওয়া উলফা অধিনায়ক (ক্যাপ্টেন) পল্লবের এ স্বীকারোক্তির সত্যতা পাওয়া গেছে।
জিজ্ঞাসাবাদে পল্লব জানিয়েছেন, তিনি ১৯৮৮ সালে উলফায় যোগ দেন। বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বর্তমানে উলফার ইউনিট-১-এ ‘ক্যাপ্টেন’ পদমর্যাদায় আছেন। সূত্রগুলো জানায়, আসাম পুলিশ ও ভারতীয় গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে পল্লব সইকিয়া তাঁর নেতৃত্বে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া আরও ১১ জন উলফা জঙ্গির নাম বলেন। এঁরা হচ্ছেন রুবুল আলী, বিশ্বেশ্বর গোহাই, লক্ষ্যজিত্ বরপুজারী, টিকলু শর্মা, রাজধর বড়ুয়া, রূপক বুজার বড়ুয়া, জয়ন্ত ইংটি, গকুল রাভা, রমেশ বরকাকোতি, শহীদ আলী ও বিপ্লব সইকিয়া।
আসাম পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পল্লব সইকিয়া বলেছিলেন, তাঁরা ছাড়াও এ হামলায় মুফতি হান্নানের নেতৃত্বাধীন হুজি জঙ্গিরা অংশ নিয়েছিল। তাঁরা তা ঘটনার পর জানতে পেরেছিলেন। এ ছাড়া আরও একটি দল হামলায় অংশ নেয় বলে পল্লবের ধারণা। তিনি তাঁর এ ধারণার কথা ভারতীয় গোয়েন্দাদেরও জানান। তবে হামলার সময় পর্যন্ত একদল আরেক দল সম্পর্কে অবগত ছিল না। ফলে ঘটনার সময় একাধিক দল আক্রমণ করছে বুঝতে পেরে উলফার লোকজন কিছুটা বিভ্রান্ত হয়েছিল। ফলে তাঁরা ‘মিশন’ শেষ না করেই ফিরে যান বলে পল্লব জানান।
পল্লব সইকিয়ার এ স্বীকারোক্তি গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর তখন উলফার পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার কথা অস্বীকার করা হয়। গত ২১ জানুয়ারি পল্লবের স্বীকারোক্তি প্রসঙ্গে উলফার মুখপাত্র রুবি ভুঁইয়া বিডি নিউজকে বলেন, ‘তিনি হয়তো প্রলাপ বকছেন, নয়তো তাঁকে চাপ দিয়ে এসব বলতে বাধ্য করা হয়েছে। আমরা অন্য কোনো দেশের রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামাই না। আমরা আসামকে ভারতের ঔপনিবেশিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করতে সংগ্রাম করছি।’
টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরেও একই ইঙ্গিত: ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার চার দিন পর ২৫ আগস্ট (২০০৪) ভারতের শীর্ষস্থানীয় ইংরেজি দৈনিক টাইমস অব ইন্ডিয়ায় এ সংক্রান্ত একটি খবর প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয়, উলফার চিফ কমান্ডার পরেশ বড়ুয়ার একটি গোপন বার্তা নিজেদের মধ্যে আদান-প্রদানের সময় ভারতীয় গোয়েন্দাদের হাতে পৌঁছায়। ওই বার্তায় পরেশ বড়ুয়া তাঁর লেফটেন্যান্ট রাজু বড়ুয়াকে নির্দেশ দেন, যাতে মিয়ানমারে থাকা উলফার ১০৯ ব্যাটালিয়ন থেকে ১৫ জন ভালো যোদ্ধাকে পাঠানো হয়। এসব যোদ্ধাকে গারো পাহাড়ে উলফার ২৮ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক পল্লব সইকিয়ার কাছে প্রথম রিপোর্ট করতে বলা হয়। সেখান থেকে তাদের ঢাকায় গিয়ে পরেশ বড়ুয়ার সঙ্গে দেখা করার কথা। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বার্তা পর্যালোচনা করে ভারতীয় গোয়েন্দাদের এই ধারণা হয় যে পরেশ বড়ুয়া দুটি কারণে ১৫ জন যোদ্ধা চেয়ে পাঠাতে পারেন। এক. তাঁর নিজের নিরাপত্তার জন্য; দুই. তিনি বড় কিছু করার পরিকল্পনা করছেন, যার জন্য দক্ষ যোদ্ধা দরকার। ঢাকায় আওয়ামী লীগের সমাবেশে হামলার পর উলফার প্রতি ভারতীয় গোয়েন্দাদের সন্দেহ বাড়ে। কারণ, এ ধরনের বড় জনসমাবেশে গ্রেনেডের মতো সমরাস্ত্র ব্যবহার করে আক্রমণ করার মতো দক্ষ জনবল উলফার আছে।
তবে ওয়াকিবহাল সূত্রমতে, এ রকম হামলা করার মতো দক্ষ লোক মুফতি হান্নানের দলসহ দেশে তত্পর আরও জঙ্গি সংগঠনেও আছে। যাঁরা আফগানিস্তান ও লিবিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।
তা ছাড়া পল্লব সইকিয়ার কাছ থেকে পাওয়া বক্তব্য কতটুকু যাচাই-বাছাই করা হয়েছে বা ২১ আগস্ট হামলায় উলফার জড়িত থাকার কথাটি কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য-এ নিয়ে ভারত সরকারও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *