চেনা সুরের রাগ-রঙ


(পর্ব-১৫)

কাফী রাগের খুব কাছাকাছি এবং খুবই জনপ্রিয় আরেকটি রাগ পীলু। দুটি রাগের মধ্যে মিল অনেক; দুটি রাগই কাফী ঠাটের অন্তর্গত এবং চলনও অনেকটা একই রকম, কিন্তু সামান্য একটু পার্থক্য যেটুকু, রসের বিচারে তাতেই অনেক বড় পার্থক্য ঘটে যায়। কাফী রাগটির মূল রস যদি বলি ভক্তি বা মধুর, তবে পীলুর রস হলো শৃঙ্গার।

কাফী রাগের কথা আগেই বলেছি। পীলু রাগের কথা বলতে গেলে প্রথমেই মনে পড়ে যাঁর কথা, তিনি হলেন ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খাঁ। তাঁর গাওয়া পীলু রাগে তিনটি অবিস্মরণীয় রেকর্ড হলো, মোরে নয়না লাগে উনিসে, কাটে না বিরহকী রাত এবং সঁইয়া বোলো তনখ্ মোসে। তিনটিই পুরোনো দিনের ৭৮আরপিএম গালার রেকর্ড এবং প্রত্যেকটিই মাত্র তিন/সাড়ে তিন মিনিটের রেকর্ড, কিন্তু শোনার পর তার রেশ থেকে যায় সারাটা জীবন। গানগুলি এখনো সহজ লভ্যই বলা যায়। তৃতীয় গানটি, অর্থাৎ সঁইয়া বোলো তনখ্ মোসে দাদরা তালে নিবদ্ধ

                +                          ০                  

      (ধা     ধি     না           না     তি     না)

       ১      ২     ৩            ৪     ৫     ৬    

 

এবং এর একটি বাংলা প্রতিরূপ আছে বেগম আখতারের কণ্ঠে, যার বাণী হলো, ‘পিয়া ভোলো অভিমান মধুরাতি বয়ে যায়’। বাংলা গানটির লেখক জ্ঞানপ্রকাশ ঘোষ।

পীলু রাগের সবচাইতে বেশি প্রচলিত ঠুংরি সম্ভবত ‘সঁইয়া তু একবারি আজা’। এই গানটির দুটি রেকর্ডের কথা বলব। প্রথমে বলি, ওস্তাদ জমীরুদ্দীন খাঁর কণ্ঠে এই গানটির বহু পুরোনো রেকর্ড আছে, যার ওপিঠে আছে একটি ভৈরবী ঠুংরী ‘রঙ্গ দেখ জিয়া ললচায়ে’। দুটি রেকর্ডই অবিস্মরণীয়, কিন্তু কালের নিয়মে এটিও প্রায় বিস্মৃতির অতলে। তবে, গানটির দ্বিতীয় যে রেকর্ডটির কথা বলছিলাম সেটি ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া এবং সেটির সিডি পাওয়া যায়, যতদূর জানি।

কিন্তু এ তো গেল ওস্তাদি গানের কথা। এবার খুব চেনা কিছু বাংলা গানের কথা বলি। তপন সিংহ পরিচালিত একটি অসাধারণ ছায়াছবি ‘হারমোনিয়াম’ এবং তার একটি অবিস্মরণীয় গান, ‘ময়নামতীর পথের ধারে দেখা হয়েছিল’। সত্যিই অবিস্মরণীয়, কারণ এতদিন পরেও ও গান ভুলতে পারিনি, ভুলতে পারেননি আমার মতো আরো অজস্র শ্রোতা। গানটি বিশুদ্ধ পীলু রাগে, শিল্পী, যুগল কণ্ঠে—মান্না দে ও বনশ্রী সেনগুপ্ত। এই ছায়াছবির সঙ্গীত-পরিচালক, সঙ্গীত রচয়িতা এবং সুরকারও তপন সিংহ। আরো একটা খুব দরকারি কথা বলার আছে; কিন্তু তার আগে, গানটি সম্পর্কে কিছু বলা প্রয়োজন। গানটি সুর বিশুদ্ধ পীলু রাগে, এ কথা আগেই বলেছি এবং এই রাগের স্থায়ী ভাব শৃঙ্গার এও বলেছি। এবার শুনুন তপন সিংহ রচিত গানটির বাণী কি বলছে—

(পুরুষ কণ্ঠে)  ময়নামতীর পথের ধারে দেখা হয়েছিল।

(নারী কণ্ঠে)   (আরে না না না!)

       তেপান্তরের মাঠের পরে দেখা হয়েছিল।

(পুরুষ কণ্ঠে)  (আরে না বাবা, না!)

       ময়নামতীর পথের ধারে দেখা হয়েছিল!

(নারী কণ্ঠে)   (উম্ হুঁ!)

       তেপান্তরের মাঠের পরে দেখা হয়েছিল।

       ময়মানতীর পথের ধারে দেখা হয়েছিল।

(দ্বৈত কণ্ঠে)   দেখা হয়েছিল তবু না দেখা যে ছিল ভাল…

 

(নারী কণ্ঠে)   কাজলা দিঘির ঘাটের ধারে দাঁড়িয়ে ছিলে অন্ধকারে

                                  (কেন গো? উম্?)

(পুরুষ কণ্ঠে)  জল আনিতে কলসী কাঁখে আসবে তুমি বলেছিলে।

(নারী কণ্ঠে)   কে বলেছিল? কে?

(পুরুষ কণ্ঠে)  ওই বামুন পাড়ার ছেলের সনে কথা হয়েছিল।

       ময়নামতীর পথের ধারে দেখা হয়েছিল।

(নারী কণ্ঠে)   তেপান্তরের মাঠের পরে দেখা হয়েছিল।

(দ্বৈত কণ্ঠে)   দেখা হয়েছিল তবু না দেখা যে ছিল ভাল…

 

(নারী কণ্ঠে)   কালবোশেখীর ঘূর্ণিঝড়ে হিজল বনে ছিলে পড়ে

                                  (কেন? কার জন্য?)

(পুরুষ কণ্ঠে)  হাটের শেষে বনের পথে ফিরবে তুমি বলেছিলে!

(নারী কণ্ঠে)   (কে গো? আমার এমন বন্ধুটি কে?)

(পুরুষ কণ্ঠে)  তোমারই এক সতীন সনে কথা হয়েছিল। …

       ময়নামতীর পথের ধারে দেখা হয়েছিল।

(নারী কণ্ঠে)   তেপান্তরের মাঠের পরে দেখা হয়েছিল।

(দ্বৈত কণ্ঠে)   দেখা হয়েছিল তবু না দেখা যে ছিল ভাল…

 

এই হলো গানটির বাণী। প্রচলিত অর্থে যাকে আমরা গীতিকবিতা বলি তার সঙ্গে একে মেলানো যাবে না। এতে অসাধারণ গীতিধর্মিতা তো আছেই সেই সঙ্গে আছে নাটকীয়তা। নায়ক-নায়িকা কথা বলছেন এবং কখনো কখনো সুর ছাড়াই (এবং এই অংশগুলি বন্ধনীর মধ্যে লেখা হয়েছে)।

লক্ষণীয়, গানটির যে ভাব তা নিঃসন্দেহেই শৃঙ্গার রসাত্মক কিন্তু প্রতিটি স্তবকের শেষ পঙ্ক্তিতে ফিরে ফিরে ‘দেখা হয়েছিল তবু না দেখা যে ছিল ভাল…’ অর্থাৎ মিলনের মধ্যে এই বিচ্ছেদের, বিরহের আভাসটুকু লেগেই থাকছে, আর এটাই পীলু রাগের ভাব। এই অনুষঙ্গে আরেকটি গানের কথা মনে পড়ছে। গানটি রবীন্দ্রসঙ্গীত—‘কাছে থেকে দূর রচিল’। ‘শাপমোচন’ নৃত্যনাট্যের এই গানটিতে পীলু এবং কাফী রাগের মিশ্রণ ঘটেছে। প্রায় সমধর্মী দুটি রাগের মিশ্রণ সহজেই ঘটানো সম্ভব, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যখনই যে কোনো গানে দুটি রাগের মিলন ঘটান তখন আর তাদের পৃথক সত্তায় খুঁজে পাওয়া যায় না; কিন্তু আপাতত এই গানটির রাগ বিশ্লেষণ নয়, বরং এই গানটির প্রথম দুটি পঙ্ক্তির কথা স্মরণ করব এবং তা হলো, ‘কাছে থেকে দূর রচিল আঁধার/মিলনের মাঝে বিরহকারায় বাঁধারে।’—মিলনের মধ্যে এই যে বিরহের বেদনা—এই হলো পীলুর ভাব, আরো সঠিক ভাবে বলতে হলে, এই হলো প্রকৃত শৃঙ্গারের ভাব এবং পীলু রাগে তারই প্রকাশ।

পীলু রাত্রির রাগ। রাত্রি প্রথম প্রহর থেকে গভীর রাত্রি। কিন্তু সে অন্ধকারের রাগ নয়। আলোর রাগ। উজ্জ্বল সে আলোর রঙ সাদা কিন্তু যেন কুয়াশার মতো মৃদু, নম্র এক আবরণে ঘেরা। ওই আবরণই শৃঙ্গার- তার বাইরে আর কিছুই নেই—অস্তিত্ব শুধু ওইটুকুই আর শুধু মহাবাস্তির মতো ওই বিরহের অন্তহীনতা—যার কথা আমরা ভুলে থাকি শৃঙ্গারের গভীরে, কিন্তু তীক্ষ্ণধার তলোয়ারের মতো সে অকস্মাৎ আমাদের বিদ্ধ হয়, … এ সব কথা হয়তো বলে বলে বোঝানোর নয়। ভাষায় শুধু তার আভাস মাত্র দেওয়া যেতে পারে—তার বেশি হয়তো নয়; কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ শ্রোতা, যাঁরা সঙ্গীত ‘ভালোবাসেন’ কিন্তু ‘বোঝেন না’ তাঁদের পক্ষে রাগের এই ভাবরূপের বর্ণনা হয়তো প্রয়োজনীয় হতে পারে। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, শুধুমাত্র এই ভাবরূপের বর্ণনা পাঠ করলেই হবে না, রাগটি অবশ্যই শোনা চাই।

প্রসঙ্গত বলি, পীলু রাগটিতে কিন্তু খেয়াল বা ধ্রুপদ জাতীয় গান গাওয়া হয় না। ভৈরবী, কাফী, খাম্বাজ ইত্যাদি রাগের মতোই, এই রাগেও ঠুংরি, দাদরা জাতীয় গান শুনতে পারেন এবং এই সব গানের প্রথামতোই মূল রাগের সঙ্গে অন্যান্য রাগের স্পর্শ থাকতে পারে। কখনো বা অন্য কোনো রাগের সঙ্গে মিশ্রণও ঘটতে পারে। যেমন, এই রকম একটি রাগ পীলু-বারোয়া যা আসলে পীলু এবং বারোয়া রাগ দুটির সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছে। বারোয়া রাগটি অবশ্য খুব বেশি শোনা যায় না। দুটি রেকর্ডের কথা আমার মনে পড়ছে। প্রথম রেকর্ডটি গেয়েছিলেন আচ্ছান্ বাঈ, ১৯০৫ সালে। কিন্তু আরেকটি অবিস্মরণীয় রেকর্ড আছে, সেটিও ৭৮আরপিএম রেকর্ড, শিল্পী ওস্তাদ লতাফৎ হুসেন খাঁ। (আগ্রা ঘরাণার এই শিল্পীর আরো একটি রেকর্ড, বিশেষভাবে মনে পড়ে। যোগ রাগে একটি খেয়াল, যে কথা আগেই বলেছি)। বারোয়া রাগটিও কাফী ঠাটের রাগ, কিন্তু পীলুর সঙ্গে মিশ্র রাগ হিসেবে ছাড়া এটি পৃথকভাবে তেমন প্রচলিত নয়; অতএব, বারোয়া রাগের কথা আরো বিস্তারিত করব না। তবে শুধু এইটুকুই বলি, এটি দুপুরের রাগ হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকে। প্রসঙ্গত এও বলি, পীলু রাগটিও অনেক সঙ্গীতজ্ঞের মতে, দুপুরেরই রাগ। একেবারেই অসম্ভব বা দুপুরের সঙ্গে রাগটি যে একেবারেই বেমানান, এমন কথা বলি না। কিন্তু পাশাপাশি মনে পড়ে বড়ে গোলাম আলি খাঁর সেই বিখ্যাত পীলু ঠুংরির বন্দিশ—‘কাটে না বিরহকি রাত…’! ‘বিরহের দুপুর কিন্তু নয়’।… ও হ্যাঁ! ভালো কথা, বহু পুরোনো একটা গানের কথা বড়ে গোলাম আলি খাঁর সূত্রেই মনে পড়ে গেল। গানটি একটি পীলু ঠুংরি। শিল্পী ওস্তাদ কালে খাঁ। রেকর্ড হয়েছিল, সম্ভবত ১৯০৪ সালে—বা ওই রকম কোনো এক সময়। আরো বলি, ওস্তাদ কালে খাঁ ছিলেন ওস্তাদ বড়ে গোলাম আলি খাঁর কাকা এবং সঙ্গীতগুরু। শুধু তাই নয়, সঙ্গীত-কোবিদ অমিয়নাথ সান্যাল তার বিখ্যাত স্মৃতির অতলে গ্রন্থে ওই সময়কার যে তিনজন মহান শিল্পীর কথা লিখেছেন তারা হলেন, ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ, ওস্তাদ মৌজুদ্দীন খাঁ এবং ওস্তাদ কালে খাঁ। অতএব তার গাওয়া ঠুংরিটি অবশ্যই শুনবেন।

খুব পুরোনো আরেকটি রেকর্ডের কথা বলি। কণ্ঠসঙ্গীতের কথা অনেক বললাম। এটি যন্ত্রসঙ্গীত। সেতারে পীলু রাগে দ্রুত গৎ, ত্রিতালে নিবদ্ধ। এ রেকর্ড শ্রবণের অভিজ্ঞতা অবর্ণনীয়। যখনই এটি শুনি, মনে হয় যেন কোনো একটি নদীর বাঁকে ঝুঁকে আছে একটি গাছ আর ঢেউয়ের তালে তালে তার পাতাগুলি দুলছে দুপুরের ছায়ায়, দুলছে আমার হৃদয়ও!

হ্যাঁ, সময়টা দুপুর বেলা—কোনো সন্দেহ নেই।

শিল্পী ওস্তাদ এনায়েৎ খাঁ! তাকে প্রণাম। (চলবে)

আরো পড়ুন : চেনা সুরের রাগ-রঙ ।। পর্ব-১৪





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *