পঁচাত্তর ট্র্যাজেডির সঙ্গত উপলব্ধি | Bhorer Kagoj


প্রকাশিত হয়েছে: আগস্ট ১৪, ২০১৮ , ৭:৫০ অপরাহ্ণ | আপডেট: আগস্ট ১৪, ২০১৮, ৭:৫০ অপরাহ্ণ

১৫ আগস্ট ১৯৭৫ স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হারিয়েছে জাতি। অভিশপ্ত এই দিনটিতে জাতির ললাটে যে কলঙ্কতিলক পরানো হয়েছিল, তার আনুষ্ঠানিক দায়মুক্তি ঘটেছে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি, দীর্ঘ ৩৪ বছর পর। বিশ্বের ইতিহাসে এ রকম বিলম্বিত সুবিচার প্রায় বিরল; এ দিক থেকে নিশ্চিতভাবেই আমরা গর্ব করতে পারি। এই বিচারের মধ্য দিয়ে তমসাচ্ছন্ন একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এরপরও কি আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি বাংলাদেশের জাতীয় জীবন থেকে ঘোর তমসা বা ষড়যন্ত্রের ইতি টানা গেছে? একদিকে জাতি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে জাতির পিতাকে, লাখো মানুষের ভিড় নামে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর সড়কে, সেইসঙ্গে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়, যেখানে ঘাতকরা এই মহাপুরুষকে অশ্রদ্ধায় শুইয়ে রেখেছিল; অন্যদিকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পুরনো ও নতুন ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের গোপন ও প্রকাশ্য তৎপরতা ঝালিয়ে নেয়। তারা মৃত শেখ মুজিবকে অস্বীকার করার ক‚টকৌশল রপ্ত করে। কারণ শেখ মুজিব ধর্মতান্ত্রিক ও সামরিক আধিপত্যবাদী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিজয়ী হয়েছিলেন। মুসলিম প্রধান বিশ্ব জনপদে তিনিই প্রথম একটি আধুনিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মৌল সংকট বুঝতে হলে, আমার বিশ্বাস, এই বাস্তবতা অনুধাবন করতে হবে এবং সাহস ও যৌগ্যতায় সামনে এগিয়ে অপশক্তিকে রুখবার শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। স্বীকার করতে দ্বিধা থাকা উচিত হবে না যে, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডটি ছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের ফসল। সেদিনের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং মুসলিম প্রধান দেশগুলোর বেশির ভাগই পাকিস্তানের বিভক্তি মেনে নেয়নি। তারা পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসরদের হাতে নির্বিচার গণহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ ও নারী নির্যাতন সমর্থন করেছে, তথাকথিত রাষ্ট্রকৌশলের নামে! অতএব দেশি-বিদেশি চক্রান্তের ফসল হিসেবে, বিশ্বাসঘাতক কিছু সপক্ষীয় রাজনীতিকের যোগসাজশে, সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী উচ্চাভিলাষী সদস্যের নির্মম বুলেটে নিহত হতে হয়েছে বঙ্গবন্ধুকে। প্রাণ হারাতে হয়েছে তার পরিবারের নিকটতম সদস্য ও আত্মীয়দের।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রের সংকট বুঝতে হলে আরো বুঝতে হবে কেন সেই ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আত্মস্বীকৃত খুনিদের শাস্তি নিশ্চিত করা হয়নি; কেন দীর্ঘ সময় ধরে তাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা করা হয়েছে? খুনিদের প্রতি এই সমর্থন বা পৃষ্ঠপোষকতা ছিল প্রায় প্রকাশ্যেই, পঁচাত্তর থেকে প্রায় দুই যুগ। অতএব ঘাতকদের রাজনৈতিক অনুসারী কে বা কারা- তাকে চিহ্নিত করতে হবে, অন্যথায় বাংলাদেশের রাজনীতির স্বরূপ বোঝা যাবে না। হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়, হতে হয়, সব দেশেই। এই বিচার আইনের শাসনের স্বার্থে, সুবিচার প্রতিষ্ঠার স্বার্থে, সভ্যতার স্বার্থে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার বিচার ঠেকাতে আইন করা হয়েছিল। দীর্ঘ ২১টি বছর এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথে কাটা হয়েছিল এই কালো আইন। কিন্তু ওখানেই শেষ নয়। বিচার প্রক্রিয়া শুরু ও বিচারিক আদালতের রায় ঘোষণা করা হলেও, উচ্চ আদালতের অনুমোদন বাধাগ্রস্ত করা হয়। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর পাঁচ বছরেও বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের আপিল শুনানি করা যায়নি! প্রশ্ন করতেই হবে, কেন? ২০০৭ সালে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার পরই কেবল বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলাটি উচ্চ আদালতে ওঠে। এরপর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের বিপুল নির্বাচনী বিজয়ের পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার নতুন করে ক্ষমতাসীন হলে চ‚ড়ান্ত বিচারের কাজটি শুরু হয়। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি কারাগারে আটক ৫ খুনির ফাঁসি কার্যকর করা হয়। বিভিন্ন দেশে আজো পালিয়ে আছে আরো ছয় খুনি। আরো অনুধাবন করতে হবে যে, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ ২১ বছর এই হত্যার বিচার হয়নি তাই নয়, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতির মৃত্যুবার্ষিকীটিও পালন করা হয়নি! ১৫ আগস্ট অতিবাহিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় অবহেলায়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরই কেবল দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হতে শুরু করে। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এসে রাষ্ট্রীয় শোক দিবস বাতিল করে। ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার জাতীয় শোক দিবস এবং সরকারি ছুটি পুনর্বহাল করে।

বঙ্গবন্ধু সব সময়ই বলতেন, বাংলাদেশ এসেছে, বাংলাদেশ থাকবে, কেউ তাকে ধ্বংস করতে পারবে না। নিশ্চিতভাবেই পারবে না। কারণ ত্রিশ লাখ মানুষের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে পারে না। লক্ষ নারীর সম্ভ্রম বৃথা যেতে পারে না। লক্ষ মুক্তিযোদ্ধার আত্মত্যাগ ব্যর্থ হতে পারে না। এরপরও কথা থাকে। বঙ্গবন্ধু কখনো কি ভেবেছিলেন কেউ তাঁকে হত্যা করতে পারে তাঁরই বাংলাদেশে? তিনি কি কখনো ভাবতে পেরেছিলেন তাঁর মৃত্যুর পর এই বাংলাদেশে আবারো পাকিস্তানি ভাবধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার সচেতন প্রয়াস হতে পারে? নিশ্চয়ই পারেননি। বাংলাদেশের রাজনীতির বাস্তবতা হচ্ছে স্বাধীনতা বিরোধীরা বসে নেই। মুক্তিযুদ্ধ ও প্রগতির অনুসারীরা নানান বিভেদে জর্জরিত। সে সুযোগে বিরুদ্ধবাদীরা সংগঠিত; তারা বাংলাদেশকে হারিয়ে দেয়ার যুদ্ধে লিপ্ত। যারা বাংলাদেশ চায়নি, তারা বাংলাদেশকে ধ্বংস করতে তৎপর, দেশে এবং বিদেশে। এই মূল্যায়নকে সামনে রেখে ১৫ আগস্ট পালন করা হলে স্বাধীনতার প্রাণপুরুষ, বাংলাদেশের জনকের প্রতি উপযুক্ত সম্মান দেখানো হবে বলে আমার বিশ্বাস।

সে কারণে যারা মনে করেন, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার বিপদের মাত্রা কমতে শুরু করেছে, আমি তাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে বাধ্য। আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিপদের সত্যিকার স্বরূপ বুঝতে হলে একদিকে যেতে হবে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর কাছে, একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের কাছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠতম পুরুষকে নিয়ে, যাঁর অতুলনীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব পরাধীন একটি জাতিকে মুক্তির মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিল, যাঁর অসীম প্রেরণা বাঙালির জাতীয় শক্তি ও সাহসের উৎস হয়েছিল, সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, তাঁর মৃত্যুর এতকাল পরও, কেন আঘাত করার চেষ্টা হচ্ছে?

বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে এই অপপ্রচারের নানা কারণ আছে। প্রধান কারণ তিনি পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র-কাঠামো ও সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক এবং সফল জনবিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন- যা একটি রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। সেই গণবিদ্রোহ এতটাই তীব্র ছিল যে, একদিকে তা শোষণ-বঞ্চনা ও স্বৈরতন্ত্রী পাকিস্তান ভেঙেছে, অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক আধুনিক এক রাষ্ট্রকে সাংবিধানিকভাবে ভিত্তি দান করেছে। ভুললে চলবে না যে, ১৯৭২-এর রাষ্ট্রীয় সংবিধান অনুযায়ী বিশ্বের গোটা মুসলিম প্রধান জনপদের মধ্যে বাংলাদেশই একমাত্র গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। বঙ্গবন্ধু যথার্থই উপলব্ধি করেছিলেন, ধর্ম ব্যক্তিজীবনের বড় অবলম্বন; রাষ্ট্র হচ্ছে ধর্ম-বর্ণ, ছোট-বড় নির্বিশেষ সবার সমান অধিকারের ক্ষেত্র। রাষ্ট্রপিতা এটিও উপলব্ধি করেছিলেন, ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রনীতি ধর্মের ঔদার্যকেই কেবল খর্ব করে না, সব মানুষের রাষ্ট্রকেও সীমিত করে, সংকোচিত করে, জনজীবন বিভাজিত করে। একজন খাঁটি ধর্মানুসারী হয়েও ধর্মের রাজনীতিকে তাই তিনি সমর্থনের কারণ খুঁজে পাননি। সে কারণেই পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে স্বদেশে ফিরে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি তিনি উচ্চারণ করেছিলেন, ‘আমি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই যে, বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে। আর তার ভিত্তি বিশেষ কোনো ধর্মীয়ভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এ দেশের কৃষক-শ্রমিক-হিন্দু-মুসলমান সুখে থাকবে, শান্তিতে থাকবে।’

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনকের এই ঘোষণাটি ছিল তাঁর কাক্সিক্ষত রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণের। অতএব এর বাস্তবায়নের পথে তিনি যখন মনোনিবেশ করেছিলেন, তিনি যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তুলতে আরেক যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন, ঠিক তখনোই তাঁকে হত্যা করা হয়।

আরো একটি কথা অনুধাবন করা সঙ্গত হবে। পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বের অনুসারীরা কখনোই বাঙালির অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তা গ্রহণ করতে পারেনি। বাঙালি যখনই অসাম্প্রদায়িক জাতীয় গৌরব নিয়ে সামনে এগিয়েছে, তার বিরোধীরা তখনই ‘ইসলাম গেল’ বলে চেঁচিয়েছে। বাঙালি জীবনের প্রাণপ্রবাহের মূল শক্তিকে তারা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের শোরগোলে সাধারণ ধর্মপ্রাণ জনগোষ্ঠী বিভ্রান্ত হয়েছে। অথচ কয়েক যুগের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বাঙালি কখনো ধর্মচ্যুত হয়নি, বরং পরিপূর্ণভাবে ধর্মের মর্যাদা রক্ষা করে সে তার অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তার গৌরবকে দৃঢ় করেছে। হোক সে ধর্মগতভাবে মুসলমান, হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ, বাঙালি ধর্মকে বিভাজনের অস্ত্র বানায়নি। ব্রিটিশ ভারতের বিভক্তি ও উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক হানাহানির আলোকে বেড়ে ওঠা মুজিব যথার্থই বুঝেছিলেন, ধর্ম কিংবা সামরিক বাহিনীকেন্ত্রিক রাজনীতি পূর্ব পাকিস্তানের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে প্রতারিত করবে, কাজেই এর বিরুদ্ধে লড়াই করাই যোগ্যতম রাজনীতি। এই উপলব্ধিতে তিনি যখন বাংলাদেশ সৃষ্টির নেতৃত্ব দিলেন, তখন ধর্ম ও বর্মবাদী রাজনীতির কুশীলবরা ভীত হয় বৈকি। অতএব বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার কৌশল আটা হলো, দেশে এবং বাংলাদেশ সৃষ্টির বিরুদ্ধবাদী নানা সব বিদেশে। তারা সফলও হলো।

হত্যাকারীদের দুর্ভাগ্য যে, ১৯৭৫-এর রক্তপাতের পর থেকেই তাদের মুখোশ উন্মোচন হতে থাকল। কারণ তারা সদ্য স্বাধীন দেশে পাকিস্তানি ধারার সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হলো, যা তারা চেয়েছিল। জেনারেল জিয়ার শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনাসিক্ত রাষ্ট্রীয় সংবিধানকে ইচ্ছেমতো কাটছাঁট করা হলো, রাষ্ট্রকে নতুন করে সাম্প্রদায়িক করা হলো। সেই থেকে শুরু হলো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পেছন যাত্রা। কেবল বঙ্গবন্ধু নন, তাঁর হত্যাকারীরা মুক্তিযুদ্ধের গোটা নেতৃত্বকে শেষ করতে উদ্যত হয়েছিল, করেছিলও। তারা মুক্তিযুদ্ধের চার নেতা- সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামানকে বন্দি অবস্থায় কারাগারে হত্যা করেছিল, উৎখাত করেছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সরকারকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হচ্ছে তিনি রাজনীতিকে মধ্যযুগীয় সাম্প্রদায়িক আবর্ত থেকে উদ্ধার করে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ ধারায় প্রবাহিত করেছিলেন। প্রথমবারের মতো বাঙালি জাতিসত্তাকে তিনি রাষ্ট্র পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৯৭০-এর দশকের বাঙালি মানসে যে অভ‚তপূর্ব দেশপ্রেম, তা ছিল জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের মানুষকে অভাবিত উজ্জীবিত করার; আগের ঐতিহাসিক আন্দোলন গুলিতে যা সম্ভব হয়নি, যা সম্ভব করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

আরো একটি বিষয় লক্ষ করার মতো। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিপদের স্বরূপ বুঝতে হলে বাংলাদেশ বিরোধী আন্তর্জাতিক মহলের তৎপরতার বিষয়টিও এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। এই মহল পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচরণ করেছিল, এমনকি বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে নীরব ভূমিকা পালন করেছিল। এমনকি তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনকের হত্যাকারীদের সুরক্ষারও ব্যবস্থা করেছিল। পঁচাত্তর পরবর্তীকালে যে সামরিক ও আধাসামরিক শাসকরা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের পুনর্বাসন করেছিল, এই আন্তর্জাতিক মহল তাদেরও পৃষ্ঠপোষকতাও করেছিল!

ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ওপর এই আঘাত চলতে থাকে প্রায় দুই যুগ। ভুললে চলবে না যে, ধারাবাহিক এবং পরিকল্পিত এই আগ্রাসনে বাংলাদেশ রাষ্ট্র অনেকটাই পথভ্রষ্ট হয়েছে, অনেকটাই বিভাজিত হয়েছে, নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ প্রতারিত হয়েছে, জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের গৌরব পর্যন্ত খণ্ডিত করা হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের ব্যর্থতা এই যে, তারা বাঙালি জাতি সত্তার অসাম্প্রদায়িক চৈতন্যের বিশাল ব্যাপ্তি ও শক্তি বুঝতে ব্যর্থ হয়। কাজেই তাদের ষড়যন্ত্রের সাফল্য স্থায়ী হতে পারেনি। বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের বা তাদের সমর্থক- অনুসারীদের আলাদা করে দেখার সুযোগ আছে বলে আমি মনে করিনে। যে নামেই আবির্ভূত হোক না কেন, এরা যে কোনো উপায়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে উৎখাত বা আঘাত করতে বদ্ধপরিকর থাকবে, কারণ তারা এতে নিজেদের অস্তিত্ব সম্পন্ন মনে করে! সে কারণেই ১৫ আগস্টের শোক পালনের তাৎপর্য উপলব্ধি করার প্রয়োজন আছে। এই উপলব্ধিকে সামনে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় শক্তির সম্মিলন, একাত্তরের মতো লড়াই। এ লড়াই বাংলাদেশ রাখার, এ লড়াই কেবল বিশেষ কোনো রাজনৈতিক দলের একার নয়, এ লড়াই বাংলাদেশের স্বাধীনতাপন্থি সবার।

হারুন হাবীব : মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও সাংবাদিক।





Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *